বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আমাদের ওয়েবসাইটে স্বাগতম (পরীক্ষামুলক স¤প্রচার)

স্কটল্যান্ডে করোনা ভাইরাস (বিস্তারিত)

মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রবিশ্ব : প্রাচ্যজীবনের নিরিখে




মোহাম্মদ বিলাল উদ্দিন কবি ও প্রাবন্ধিক। মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট, বাংলাদেশ- এ বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। মুরারিচাঁদ কলেজে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনার শতবর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে তাঁর ‘মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রবিশ্ব : প্রাচ্যজীবনের নিরিখে’ প্রবন্ধটি পঠিত হয় এবং ‘মুরারিচাঁদ কলেজ জার্নাল’, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি ‘বাংলা স্কট’- এর পাঠকদের জন্য পত্রস্থ করা করা হল।

সার-সংক্ষেপ
  রবীন্দ্রনাথ কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তক বিশ্ববোধে উজ্জীবিত এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মে চিরায়ত বিশ্ববোধের প্রকাশ ঘটেছে। এই বিশ্ববোধের মূলে রয়েছে প্রাচ্যজীবন-এশীয় ধর্ম-পুরাণ-লোকাচার, দর্শন-সমাজ-রাষ্ট্রচেতনা, প্রকৃতি ও প্রতিবেশ। বলা যায়, প্রাচ্যজীবনের আলো -জল-মৃত্তিকা, ইন্দ্রিয়-অতীন্দ্রিয়প্রবণতা ও অধ্যাত্মবাদ, লৌকিক ও অতিপ্রাকৃত সকল বোধ ও বিশ্বাস এবং এশীয় ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক সংকটের প্রতিফলন রয়েছে তাঁর কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, চিঠিপত্রে, সঙ্গীতে, চিত্রকলা ও অন্যবিধ রচনায়। তিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মানসচৈতন্যকে ধারণ করেছিলেন; প্রাচ্যজীবনের সঙ্গে প্রতীচ্যের সারাৎসার মিলিয়ে দিয়ে চেয়েছিলেন এক মহত্তম ভারতীয় জীবন, যা প্রচলিত সমাজ, রাষ্ট্রচিন্তা ও জাতীয়তাবাদের ধারনার থেকে ভিন্ন। রোমান্টিকতা ও মিস্টিকতা, মানুষের ধর্ম ও জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ভাবজগৎ এবং দুটো বিশ্বযুদ্ধ যেমন রবীন্দ্রনাথের প্রতীতির জগতে বিবর্তন ও ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছিল, তেমনি বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতি তাঁর মানসজগতে নতুনচিন্তা যোজন করেছিল। এমনকি ‘সভ্যতার সংকট’ প্রশ্নে তাঁর বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত থিতু হয়েছিল প্রাচ্যজীবনচর্যায়।
  রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্ববোধ ও প্রাচ্যভাবধারা নিয়ে অনেক মূল্যবান গবেষণা হয়েছে। শ্রীভূমি হিসাবে খ্যাত শ্রীহট্টে উনিশ শতকের একেবারে শেষ দিকে উত্তর—পূর্ব ভারতের শ্রীহট্টে প্রতিষ্ঠিত হয় মুরারিচাঁদ কলেজ (১৮৯২)। বাংলাভাষি শ্রীহট্ট তখন বঙ্গ থেকে নির্বাসিত (১৮৭৪); আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রান্তিক জনপদ। মুরারিচাঁদ কলেজই তখনকার নবগঠিত আসাম প্রদেশের জ্ঞানচর্চার একমাত্র পীঠস্থান এবং এখানে অপূর্বচন্দ্র দত্ত, সতীশচন্দ্র রায়, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, নীহাররঞ্জন রায়, প্রবোধচন্দ্র সেন, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অশোকবিজয় রাহা, প্রমুখ পণ্ডিতব্যক্তির জ্ঞানতপস্যা বিকশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় যেমন এখানে ব্যাপক রবীন্দ্রচর্চা হয় তেমনি রবীন্দ্রপ্রয়াণের পরেও তা থেমে থাকেনি। ১৯১৯ সালে সুরমা উপত্যকার শ্রীহট্ট ও মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে রবীন্দ্রনাথের আগমন একটি অনুপ্রেরণাময় ঘটনা এবং এরপর থেকে এখানে রবীন্দ্রচর্চা একটি বিশেষ মিথে পরিণত হয়। মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে কবিকে প্রদত্ত অভিনন্দন এবং এর উত্তরে রবীন্দ্রপ্রদত্ত ‘আকাক্সক্ষা’ নামক অভিভাষণ নিঃসন্দেহে এই জনপদে নতুন স্বপ্নডানার বিস্তার ঘটিয়েছিল। এমনকি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত এই স্বপ্নডানায় ভর দিয়ে রবীন্দ্রচচার্ বহমান। নানাভাবে মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যাপক ও শিক্ষাথীবৃন্দ রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধ, দেশকাল, লোকজীবন, প্রকৃতিচেতনা ও মিস্টিকতা এবং শিল্পবোধকে বিশ্লেষণ করেছেন। এ বিষয়ে মুরারিয়ানদের প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যজীবন-অনুষঙ্গ। বৃটিশপর্ব থেকে সম্প্রতিককাল পর্যন্ত প্রকাশিত মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনসমূহ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে কমপক্ষে উনিশটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যজীবনবোধকে বিশ্লেষণ করেছেন মুরারিয়ানরা। বর্তমান গবেষণাপত্র তাঁদের রবীন্দ্রবীক্ষা অবলম্বনে রচিত। এ কাজে রবীন্দ্রজীবন ও সৃষ্টিকর্ম এবং মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন ও অন্যত্র প্রকাশিত মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রনাথবিষয়ক রচনাগুলোই গবেষণার আকর বা অধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মুরারিচাঁদ কলেজ হতে ১৯১৭-২০১৬ খ্রি.পর্যন্ত প্রকাশিত কলেজ ম্যাগাজিনে মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯১৭-১৯৩৯ খি. পর্যন্ত মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন ছিল একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা, তখন রবীন্দ্রনাথ জীবিত। এটি মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রভাবনার প্রথম পর্ব; দ্বিতীয় পর্ব ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত; এ সময়কালে রবীন্দ্রনাথ এ দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রায় পরিত্যাজ্য। তৃতীয় পর্ব হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন ও পরবতীর্ সময়কাল। প্রথমপর্বে শ্রীহট্ট বা সুরমা উপত্যকায় রবীন্দ্র – দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে তত্ত্বীয়ভাবে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে রয়েছে বিরুদ্ধস্রোতে  রবীন্দ্রচৈতন্যের বিকাশ। রবীন্দ্রোত্তরকালে এই জনপদ ও মুরারিয়ানদের জীবনে যুক্ত হয়েছিল দেশভাগ ও ত্যাগ, পাকিস্তান সৃষ্টি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের মতো ঘটনাবলি।
    মুরারিয়ানরা নানাভাবে রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করেছিলেন এবং এই প্রান্তিক জনপদে সেভাবেই রবীন্দ্রচৈতন্য সমাজেতিহাসের ক্রান্তিকালে আলোকসম্পাত করেছিল। কবি রবীন্দ্রনাথ, রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তক রবীন্দ্রনাথ কিংবা শিক্ষাচিন্তক রবীন্দ্রনাথ – কোন রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করেছিলেন মুরারিয়ানরা, বর্তমান প্রবন্ধে প্রধানত সে বিষয়েই তাঁদের রচনাবলির আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুরারিচাঁদ কলেজে বিভিন্ন সময়ে পাঠদান ও গ্রহণকারী অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীবৃন্দকে ব্যাপক অর্থে ‘মুরারিয়ান’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হল।
    চাবি শব্দ : মুরারিয়ান, প্রাচ্য, দর্শন, ইন্দ্রিয়, অধ্যাত্মবাদ, সুরমা উপত্যকা, প্রতীচ্য , ধর্ম, বৈষ্ণব, বাউল, রোমান্টিক, মিস্টিক, রাষ্ট্র।

মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রবিশ্ব : প্রাচ্যজীবনের নিরিখে’

প্রবন্ধের শুরুতেই শিরোনামের ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। প্রবন্ধটিতে ‘মুরারিয়ান’ বলতে মুরারিচাঁদ কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অদ্যাবধি অধ্যয়নকারী শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাদানকারী অধ্যাপকবৃন্দকে বোঝানো হয়েছে। ‘প্রাচ্যজীবন’ বলতে বোঝানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যজীবন ও দর্শন। ‘প্রাচ্যজীবনে’র দুটি অংশ চিহ্নিত করা হয়েছে বর্তমান প্রবন্ধে যার একটি অংশ প্রাচ্যজীবনপ্রবাহে রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ খিষ্টাব্দে ৫ নভেম্বর সিলেটে ও ৭ নভেম্বর মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে আগমন করেন এবং মুরারিয়ানরা তাঁর সন্দর্শন দ্বারা প্রাণিত হন। অপর অংশ মুরারিয়ানদের জীবনে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের স্বরূপ বিশ্লেষণ। প্রথম অংশে সিলেটে রবীন্দ্রনাথের আগমনকালীন মাহেন্দ্রক্ষণটি ফিরে দেখা হবে যাতে রবীন্দ্রপ্রভাব অনুধাবনে সহজ হয় এবং দ্বিতীয় অংশে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে মুরারিয়ানদের নির্বাচিত রচনা থেকে রবীন্দ্রচর্চার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হবে। এ বিষয়ে বিবেচ্য হবে মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন এবং অন্যত্র প্রকাশিত মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রবিষয়ক রচনাসমূহ। মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন প্রথম প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির বছর চারেক পর, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে; প্রকাশনার প্রথম তিনবছরের ম্যাগাজিনের কোনো সংখ্যা পাওয়া যায়নি। সুতরাং নোবেলপ্রাপ্তির পূর্বের রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সৃষ্টিসম্ভার সম্পর্কে মুরারিয়ানরা কতোটা পরিচিত ছিলেন কিংবা নোবেলপ্রাপ্তিতে মুরারিয়ানগণ কোনো প্রকার অভিনন্দন জ্ঞাপন করেছিলেন কি-না অন্যরূপ উৎস থেকেও বিষয়টি জানা যায় না। কলেজ ম্যাগাজিন পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের সিলেট ও মুরারিচাঁদ কলেজ ভ্রমণের পরের বছর অর্থাৎ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে, তবে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ম্যাগাজিনের ৩য় বর্ষ, ২য় সংখ্যায় যতীন্দ্রকুমার পাল চৌধুরী নামে জনৈক ছাত্র ‘শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ’ নামে প্রবন্ধ লেখেন বলে জানা যায় (ভট্টাচার্য্য, ২০০২ : ৮; আজিজ, ২০১৪: ৫৩)। অন্যরূপ তথ্য না-পাওয়া পর্যন্ত এটিকেই কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত রবীন্দ্রবিষয়ক প্রথম রচনা বলেই ধরে নিতে হবে এবং এটি রবীন্দ্রনাথের শ্রীহট্টভ্রমণের পরপরই প্রকাশিত হয়। অবশ্য সিলেটের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছিল নোবেলপ্রাপ্তির বহু পূর্ব থেকে— পারিবারক, সামাজিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় সখ্যতাও গড়ে ওঠে। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে সিলেটের জনজীবনে সঞ্চারিত হয় রেনেসাঁস— বিকশিত হয় দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, গড়ে ওঠে অনেকগুলো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রকাশিত হয় শতাধিক সাময়িক পত্রিকা। যার ফলে রবীন্দ্রসাহিত্য এবং সমকালীন সৃষ্টিসম্ভারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন মুরারিয়ানরা। তবে রবীন্দ্রনাথের শ্রীহট্টভ্রমণের পর থেকে রবীন্দ্রবিষয়ে মুরারিয়ানদেরকে কলেজ ম্যাগাজিনে উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায়। রচনার দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বর্তমান প্রবন্ধে মুরারিয়ানদের ওপর প্রধানত রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ পরবর্তী প্রভাব বিশ্লেষিত হয়েছে।

এক. ‘জগৎ পারাবারের মেলা মাঝারে তব বাঁশরী বাজে’

মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রভাবনার প্রথম পর্বের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে কলেজ ছাত্রাবাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা প্রদান। রবীন্দ্রনাথকে সিলেট ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং ছাত্রাবাসে সংবর্ধনা প্রদান করে মুরারিচাঁদ কলেজ এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। রবীন্দ্রনাথ যখন চৌদ্দ বছরের কিশোর, তখন বঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় শ্রীহট্ট। সমগ্র আসামে তখন কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কলেজ ছিল না। তিনি যখন বত্রিশ বছরের টগবগে তরুণ এবং কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তখন শ্রীহট্টে ১৮৯২ সালে রাজা গিরীশচন্দ্র রায়ের ঐকান্তিক দানে প্রতিষ্ঠিত হয় মুরারিচাঁদ কলেজ। সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যে সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাঁর একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয় ১৯১৪ খ্রি. পতিসরে, ১৯১৯-এ সিলেটে, ১৯২২-এ শিলাইদহে, ১৯২৬-এ ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে এবং ১৯৩৭-এ দ্বিতীয়বারের মতো পতিসরে। সিলেট ও ঢাকায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল যথাক্রমে ‘হিন্দু মুসলমান জনসাধারণের পক্ষ হইতে’  এবং ‘হিন্দু মোসলেম সেবাশ্রম’-এর পক্ষ হতে । সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ, ব্রাহ্মসমাজ, শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আমন্ত্রণে কবি সিলেট আসেন ৫ নভেম্বর। সিলেট ভ্রমণের জন্য মুরারিচাঁদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুরেশ সেনগুপ্ত তারবার্তা প্রেরণ করে কবিকে আমন্ত্রণ জানান। (আলী, ১৩৭১ : ৭৩১) কবির আগমন উপলক্ষে ১৩২৬ বাংলার ১৮ কার্তিক বেলা তিনটায় মুরারিচাঁদ কলেজের স্বেচ্ছসেবী দল গঠিত হয়। আঞ্জুমানে ইসলামিয়া তাদের সেবকসংঘ ও সেচ্ছাসেবী দল গঠন করেছিলেন আগেই। (দাশ ২৩ : ১৯১২) মুরারিচাঁদ কলেজের তৎকালীন ছাত্র সৈয়দ মোস্তফা আলী (১৮৯১-১৯৭৭) তাঁর ছাত্রজীবন (১৯১৮-১৯২০) ও রবীন্দ্রনাথের শ্রীহট্ট-আগমন প্রসঙ্গে ‘আত্মকথা’য় লিখেছেন—

অধ্যাপক কুণ্ডু ও অধ্যাপক সেন (অঙ্কের ) ক্লাশ পাঠ্য বিষয়ের বাইরে কোন আলোচনা করতেন না—অধ্যাপক স্যান্যাল অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা ও খোশগল্প করতেন— কিন্তু সবার উপরে টেককা দিয়েছিলেন— ইংরাজীর প্রধান অধ্যাপক সুরেশ সেনগুপ্ত। ১৯১৯ ইং মার্চ মাসে তিনিই ক্লাসে ঘোষণা করলেন যে রবীন্দ্রনাথ শিলং গিয়েছিলেন— ফেরার পথে শ্রীহট্টে পদার্পণ করবেন— সঙ্গে সঙ্গে বললেন, জান, রবীন্দ্রনাথ আসতে চাননি— কিন্তু আমার টেলিগ্রামই তাঁকে সাড়া দিতে বাধ্য করলো—টেলিগ্রামের ড্রাফ্ট আমারই ছিল— আমি লিখেছিলাম ‘Sylhet desires India’s Greatest son to honour her by his visit’— কবি আসছেন এই কয়েকদিনের মধ্যেই। (আলী, ১৩৭১ : ৭৩১)

সিলেটে কবিকে অভ্যর্থনা জানান সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ ( পরে আসামের শিক্ষামন্ত্রী), সিলেট পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী , জননেতা রায় বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, কবির সুহৃদ মৌলভী আবদুল করিম (ডিপিআই), নলিনীবালা চৌধুরী প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ছাত্রজনতা। (আলী, ১৩৭১ : ৭৩১) ৬ নভেম্বর রতনমণি লোকনাথ টাউন হলে প্রায় পাঁচ হাজার জনতার সমাবেশে (দাশ, ২০১২ : ২৬) অভিভাষণে কবি ‘বাঙালির সাধনা’ বিষয়ে বক্তৃতা করেন। সিলেটে তিনটি সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয় কবিকে। ৬ নভেম্বর সকাল দশটায় ( দাশ, ২০১২ : ২৫) টাউন হলে ‘শ্রীহট্টের জনসাধারণ’, দুপুর দুটোয় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে ‘শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি’ (ভূঁইয়া, ৮ : ১৯৯৩) এবং ৭ নভেম্বর ‘মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রবৃন্দে’র দ্বারা কলেজের ছাত্রাবাসে। বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রবিশ্ব। সুতরাং শ্রীহট্টে রবীন্দ্রসংবর্ধনা বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ দেওয়ার অবকাশ এখানে নেই। ‘শ্রদ্ধাবনত শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রবৃন্দ’ কবিকে ‘ভারত-গৌরব-রবি কবি সম্রাট শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের করকমলেষু’ শীর্ষক যে মানপত্রটি  প্রদান করেন তা শুধু ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, রবীন্দ্রজীবন ও সৃষ্টিকর্ম সম্মন্ধে গভীর পঠনপাঠন ও উপলব্ধির ফসল। মানপত্রটিতে বলা হয়—

আপনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাধনার সমাবেশে, শান্তিনিকেতনের আনন্দের ভিতর, শিক্ষা-পদ্ধতির যে অপূব্বর্ আদর্শে, আদর্শমানব গড়িয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেছেন, তাহা বিফল হইবার নহে।…আপনার সাধনা জগতকে বাদ দিয়া নয়; আপনার সাধনা জগতকে লইয়া। হে প্রেমের অদ্বিতীয় সাধক, আপনার বিশ্বজনীন ভাবরাশি কোন সা¤প্রদায়িক গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ নহে। আপনার জীবনতীর্থে প্রেমগঙ্গা মহা-মহোৎসবে ছুটিয়া চলিয়াছে, জগৎ সে বন্যায় ধুইয়া মুছিয়া পবিত্র হইয়া গিয়াছে, তাই আপনাকে অভিনন্দিত করিতেছি। ( উদ্ধৃত, ভূঁইয়া, ১৯৯৩ : ৬০)

মুরারিচাঁদ কলেজ কতৃর্ক সংবর্ধনার আগের দিন অর্থাৎ ৬ নভেম্বর অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রীর বাসায় সপরিজনে নৈশভোজ গ্রহণ করেন কবি। নলিনীমোহন শাস্ত্রী ছিলেন মুরারিচাঁদ কলেজের বাংলা ও সংস্কৃতের অধ্যাপক এবং কবি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবিকে নিবেদন করে তিনি ‘পূজ্যপাদ ডাক্তার শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয়ের শ্রীচরণে’ শীর্ষক স্বরচিত কবিতাটি পাঠ করেন । এ প্রসঙ্গে নৃপেন্দ্রলাল দাশ লিখেছেন—

সিলেটে সর্বশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয় মুরারীচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে। ঐ কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলী সংবর্ধনার আয়োজন করেন। ছাত্ররা একটি শোভাযাত্রা সহকারে কবিকে হোস্টেলে নিয়ে যায়, এজন্য চৌহাট্টায় সর্ববৃহৎ মণ্ডপ তৈরি করা হয়। কলাগাছ ও নানা রঙের পতাকা ও মালায় শোভন করা হয় মঞ্চগৃহকে। বসানো হয় মঙ্গলঘট। মহিলাদের জন্য বসার আলাদা ব্যবস্থা করা হয়। জনৈক ছাত্র সবাইকে সাদর আমন্ত্রণ জানায়। প্রারম্ভে অধ্যাপক নলিনী শাস্ত্রী স্বরচিত কবিতা দ্বারা রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানান। (দাশ, ২০১২ : ৩০)

এরপর পাঠ করা হয় মানপত্র। সংবর্ধনার উত্তরে কবি প্রায় ঘণ্টাকালব্যাপী ‘আকাঙ্ক্ষা’ বিষয়ে বক্তৃতা করেন। রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত নলিনীমোহন শাস্ত্রীর কবিতা এবং শিক্ষার্থীদের অভিনন্দনপত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এজন্য যে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় সিলেট থেকে কলকাতার যোগাযোগ ছিল দুর্গম এবং গ্রন্থাবলি ছিল অপ্রতুল, তা সত্ত্বেও মুরারিয়ানরা কবির ভাবজগতের মূল সুরটুকু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রভাবধারা সম্পর্কে নলিনীমোহন শাস্ত্রীর কবিতাটিতে বলা হয় ‘জগৎ পারাবারের মেলা মাঝারে তব বাঁশরী বাজে’। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একশত বছর পরেও একথাই সত্য যে, রবীন্দ্রভাবনায় আলো-জল-মৃত্তিকা-মানুষ ও বিশ্বলোক এক অবিচ্ছিন্ন ঐকতানে গ্রথিত, ‘জগৎ পারাবারের মেলা মাঝারে’ কবি যেনো সে বাঁশরীই বাজিয়েছেন জীবনভর। মানপত্রে এবং কবিতায় মুরারিয়ানরা সেদিন সার্থকভাবে রবীন্দ্রসত্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। সেদিন ‘সবসুদ্ধ প্রায় চার হাজার লোক সমবেত হয়েছিল কবির বক্তৃতা শুনবার জন্য, তন্মধ্যে প্রায় হাজার দুয়েকই হবে ছাত্র। (সিংহ, ২০০২ : ৬) রবীন্দ্রনাথও শ্রীহট্ট ভ্রমণ সম্পর্কে ছিলেন উচ্ছ্বসিত। অপরপক্ষে মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসে কবির ‘আকাঙ্ক্ষা’  শীর্ষক বক্তৃতা সৈয়দ মুজতবা আলীর আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবিক অর্থে বৃহৎ করে তোলে, তিনি শান্তিনিকেতনে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান। মুরারিয়ানদের ওপর রবীন্দ্র আগমনের প্রভাব পরবতীর্কালে সম্মন্ধে সৈয়দ মোস্তফা আলী ‘আত্মকথা’য় লিখেছেন—

রবীন্দ্রনাথ শ্রীহট্টে দু্ই দিনের অবস্থানের পর আগরতলার মহারাজার আহ্বানে আগরতলা চলে যান। আর বিশেষ করে আমাদের ছাত্র মহলে, বিসর্জনের পর হিন্দু ভ্রাতাদের মনে যে ভাবের উদয় হয়; সেইরূপ অনেকটা ভাব প্রকাশিত হয়—অনেকেই কবি সুলভ বাবরী ছুল [চুল] রাখতে আরম্ভ করলেন। আমার সহাধ্যায়ী কুমুদ বন্ধু দত্ত…. ও সূনীল দত্ত বেশ কতক দিন বাবরী চুল রেখেছিলেন। (আলী, ১৩৭১ : ৭৩৬)

সংবর্ধনা সভায় কলেজের অধ্যক্ষ অপূর্বচন্দ্র দত্ত ও কলেজের অধ্যাপকমণ্ডলী উপস্থিত ছিলেন। কবির অভিভাষণ শেষে কলেজের অধ্যক্ষ এক মনোজ্ঞ ভাষণ দেন। (দাশ, ২০০২ : ৩৫) বছর কয়েক পরে সৈয়দ মোস্তফা আলী শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। সেখানকার অসাম্প্রদায়িক ও রুচিশীল পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন—

জীবনে আর একবার এই রকম সুরুচি সম্পন্ন ভোজনের ব্যবস্থা দেখেছি আর এক জায়গায়— যখন ১৯২২ ইংরেজিতে পৌষ মাসে, ৭ই পৌষের আশ্রম প্রতিষ্ঠা দিবসে, আমার কনিষ্ঠ মুজতবা আলীর অভিভাবক রূপে আমি ডাঃ শহীদুল্লার সঙ্গে ঢাকা হইতে শান্তিনিকেতনে যাই। সেখানেও সুরুচি সম্মত রাজসিক ভুরিভোজনের ব্যবস্থায় পরম পরিতোষ লাভ করি। তবে শান্তিনিকেতনে যে তিনদিন ছিলাম— কোন আমিষের ব্যবস্থা ছিল না—সবই নিরামিষ—তবে তাহা এতোই চমৎকার ছিল যে আমিষের অভাব এতটুকুও অনুভব করি নাই। কবি গুরুর পুত্র স্বয়ং রথীন্দ্রনাথ বড় বড় ঝকঝকে বালতী হতে খাদ্য সম্ভার পরিবেশন করছিলেন—মস্ত মস্ত পেতলের হাতা দিয়ে—আর আমরা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বসে ছিলাম এক জায়গায়। (আলী, ১৩৭১ : ৭৩৯ )

কবিকে সংবর্ধনা প্রদানের প্রতিবেদন এবং কবির অভিভাষণ প্রকাশিত হয় মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনে (The Murarichand College Magazine Vol. iii . no.ii.,1919) , এতে যতীন্দ্রকুমার পাল চৌধুরী নামে জনৈক ছাত্র ‘শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ’ নামে প্রবন্ধ লেখেন। রবীন্দ্রনাথের আগমন ও বক্তৃতা মুরারিচাঁদ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী তো বটেই, গোটা সুরমা-বরাক উপত্যকাবাসীকে আন্দোলিত করে। মুরারিচাঁদ কলেজ কর্তৃপক্ষ কীরকম আগ্রহী হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বছর দুয়েক পরের কলেজ ম্যাগাজিনে। The Murarichand College Magazine,  ভলিয়্যুম-৫, সংখ্যা-৩-এর ‘লাইব্রেরি বুলেটিনে’ দেখা যায়, ১৯২১-২২ শিক্ষাবর্ষে মুরারিচাঁদ কলেজ লাইব্রেরির জন্য বাংলা বিষয়ে ৮৯টি বই ক্রয় করা হয় যার মধ্যে ১১ থেকে ৪১ ক্রমিক পর্যন্ত ৩১টিই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নানাবিধ গ্রন্থ। গ্রন্থগুলো হলো—

সংকল্প ও স্বদেশ; চৈতালি; চিত্রা; কল্পনা; কড়ি ও কোমল; ক্ষণিকা; কণিকা; কথা ও কাহিনী; সোনার তরী; পলাতকা; মানসী; নৈবেদ্য; বলাকা; সন্ধ্যা সংগীত; ছবি ও গান; প্রভাত সংগীত; প্রকৃতির প্রতিশোধ; মালিনী; ঋণ-শোধ; মুকুট; ফাল্গুনী; শারদোৎসব; অরূপ রতন; ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী; শেফালি; কেতকী; বৈতালিক; কাব্যনীতি; গীত পঞ্চাশিকা; গান।

The Murarichand College Magazine, Vol.v. no. iii. 1921-22

দুই . ‘ চিত্ত ভরিয়া স্মরণ করি ’

মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রবিশ্ব গড়ে ওঠে প্রথমত রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় মুরারিয়ান নীহাররঞ্জন রায় (১৯০৩-১৯৮১), প্রবোধচন্দ্র সেন (১৮৯৭-১৯৮৬), সতীশচন্দ্র রায় (১৮৮৮-১৯৬০), অশোকবিজয় রাহা , যতীন্দ্রনাথ দত্ত, দ্বারেশচন্দ্র শমার্চার্য্য, ফণীন্দ্রনাথ দত্ত, অধ্যাপক এস সি সেনগুপ্ত (১৮৮৯ -?), রামেন্দ্রকুমার দেশমুখ্য, রবীন কর, বিজিত চৌধুরী প্রমুখের রবীন্দ্রবিষয়ক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রচনা রয়েছে। 

ছবি: মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে রবীন্দ্র-আগমনের শতবর্ষপূর্তিতে প্রকাশিত জার্নাল

মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ (১৯৪০-৪১) সতীশচন্দ্র রায় (১৮৮৮-১৯৬০) লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে অধ্যয়নকালে ১৯১২ খ্রি. রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় হয়, আমৃত্যু তাঁর সঙ্গে ছিল পত্রযোগাযোগ। সতীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো রচনার অনুবাদ করেন, রচনা করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। নীহার রঞ্জন রায় মুরারিচাদ কলেজে ১৯২২-২৪ খ্রি. পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তিনি কলেজের ইতিহাসে স্নাতক সম্মান শ্রেণির ছাত্র (প্রথম ব্যাচ) হিসাবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদিপর্ব (১৯৪১), রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভূমিকা (১৯৪১), কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি (১৯৭৯) প্রভৃতি তাঁর অমর কীর্তি। রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভূমিকা গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যলয় কর্তৃক প্রকাশিত হয়। সেসময়ে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের সকল রচনার মূল্যায়ন করা হয়েছে গ্রন্থটিতে এবং বর্তমানকালেও এটির গুরুত্ব কোনো অংশে কমেনি। গ্রন্থটির ‘প্রথম সংস্করণের নিবেদনে’ নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন—

রবীন্দ্রনাথের আশি বৎসর পূর্ণ হইতে চলিল। বাঙ্গালী ও ভারতবাসীর পরম সৌভাগ্যের বিষয়, তিনি আজও আমাদের মাঝে বর্তমান। জরা তাঁহার বলিষ্ঠ মন ও চিত্তকে জীর্ণ করিতে পারে নাই; ক্ষীয়মান দেহের শাসন-নাশন উপেক্ষা করিয়া তাঁহার বুদ্ধি ও কল্পনা আজও থাকিয়া থাকিয়া প্রকাশ করিতেছে। (রায়, ১৩৪৮ : প্রথম সংস্করণের নিবেদন)

প্রবোধ চন্দ্র সেন (১৮৯৭-১৯৮৬) নীহাররঞ্জন রায়ের সহপাঠী ছিলেন, একই সঙ্গে দুজনে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের দান (১৯৩১), ছন্দগুরু রবীন্দ্রনাথ  (১৯ ৪৫), ছন্দ পরিক্রমা (১৯৬৫), বাংলায় হিন্দু রাজত্বের শেষ যুগ (১৯৩০) প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ। সেকালে রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক পরিমণ্ডলে বেদ ও ঊপনিষদের মর্মবাণী নিত্যদিন চর্চিত হত এবং রবীন্দ্রনাথ সেই চৈতন্যকে ধারণ করে প্রকৃতিকে মানবজীবনের উৎসমূল হিসেবে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন তাঁর সাহিত্যে বিশেষত কবিতা ও গল্পে। শৈশবের পরিমণ্ডল তাঁকে শিখিয়েছিল যে, সকল প্রাণী, মাটি, বৃক্ষলতা, আকাশ এবং বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে জীবন্ত থাকে। মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষের কোনও অস্তিত্ব নেই। রবীন্দ্রকবিতার স্বরূপ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সৈয়দ আহসান লিখেছেন—

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির কবি, একথা বললে রবীন্দ্রনাথের কবিতার মূল্যায়ন হয় না। কারণ তিনি প্রকৃতির বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন নি। মনে রাখতে হবে যে, যে প্রকৃতি জীবনের উৎস মূল, সেই উৎসমূলকে রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করতে গিয়েছিলেন। (আহসান, ১৯৭৪ : ২)

তাঁর রূপ থেকে অরূপে গমন ভারতীয় জীবনধারার ফসল—অতীন্দ্রিয়বোধ, রোমান্টিকতা, মরমীচিন্তা প্রভৃতির মর্মমূল এরই মাঝে নিহিত। কবি অশোক বিজয় রাহা (১৯১০-১৯৯০) মুরারিচাঁদ কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক ও বিএ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন ১৯২৭-৩১ খ্রি. পর্যন্ত। কলেজ ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রবিষয়ক তাঁর কোনো প্রবন্ধ পাওয়া যায় না, তবে এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রবন্ধসংগ্রহ (২০১৩) গ্রন্থের ‘রবীন্দ্রকাব্যে ইন্দ্রিয়চেতনার রূপান্তর’, ‘রবীন্দ্র-প্রতিভার স্বরূপ’, রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা’, ‘রবীন্দ্রকাব্যে শিল্পের ত্রিধারা’ নামক রবীন্দ্রবিষয়ক প্রবন্ধগুলো উল্লেখযোগ্য। ‘রবীন্দ্রকাব্যে ইন্দ্রিয়চেতনার রূপান্তর’ প্রবন্ধটিতে তিনি রবীন্দ্রকাব্যে মানুষের ইন্দ্রিয়চেতনার প্রয়োগ-সংক্রান্ত নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, রবীন্দ্রকাব্যে মানুষের ইন্দ্রিয়চেতনা যথা—দৃষ্টি, শ্রুতি, স্পর্শ, ঘ্রাণ ও স্বাদের কয়েকটি বিশেষ পর্যায়ের মিশ্রণ ও রূপান্তর ঘটেছে এবং এই মিশ্রণ ও রূপান্তরের ফলে কবিতাসমূহ ঐশ্বর্যময় হয়ে উঠেছে। অশোকবিজয় রাহা লিখেছেন—

এবার আমরা রবীন্দ্রকাব্যে ইন্দিয়চেতনার কয়েকটি বিশেষ পর্যায়ের মিশ্রণ ও রূপান্তরের আভাস দিচ্ছি। আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় চেতনার মধ্যে প্রত্যেক দুটিকে নিয়ে গাণিতিক ‘বিন্যাস’ (permutation) ও ‘সমবায়ে’র (combination) হিসাবে রূপান্তরের সবসুদ্ধ বিশটি প্রকারভেদ হতে পারে।…. এখানে মুখ্যত তিনটি ইন্দ্রিয়চেতনা বেছে নিচ্ছি : দৃষ্টি শ্রুতি ও স্পর্শ। গাণিতিক হিসাবে এদের মধ্যে ছয় রকম রূপান্তর হতে পারে : দৃষ্টি ও শ্রুতি র মধ্যে ‘রূপের ধ্বনি’ ও ‘ধ্বনির রূপ’; দৃষ্টি ও স্পর্শের মধ্যে ‘রূপের স্পর্শ’ও ‘স্পর্শের রূপ’; শ্রুতি ও স্পর্শের মধ্যে ‘ধ্বনির স্পর্শ’ ও ‘স্পর্শের ধ্বনি’। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন : ‘ঝরিছে মুকুল, কূজিছে কোকিল, যমিনী জোছনামত্তা’ তখন এতে মকুলবৃষ্টির স্পর্শ, কোকিলের গান, এবং জ্যোৎস্নারাতের রূপ—স্পর্শ শ্রুতি ও দৃষ্টি -এ তিনটি চেতনাকেই একসঙ্গে অনুভব করা যায়। (রাহা, ২০১৩ : ২৪)

বর্তমান প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে মুরারিচাঁদ কলেজ হতে প্রকাশিত ম্যাগাজিনের রবীন্দ্রবিষয়ক প্রবন্ধগুলো বিশ্লেষণ করা হলো। মুরারিচাঁদ কলেজের ম্যাগাজিন প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে, ব্রিটিশ পর্বের নাম ছিল The Murarichand College Magazine। এতে চিন্তাচর্চা হতো দুটি ভাষায়—প্রথম অংশে ইংরেজিতে; সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং বিজ্ঞানচিন্তা, অনুবাদ, সম্পাদকীয়, কলেজের সামগ্রিক প্রতিবেদন ইত্যাদি। দ্বিতীয় অংশে ছিল মাতৃভাষায় চিন্তাচর্চা—সাহিত্য-সমাজ-ইতিহাস-দর্শননির্ভর প্রকাশনা। উভয় অংশে ছিল গবেষণামূলক প্রবন্ধ। প্রথম বর্ষে ম্যাগাজিনের আট সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এক বছরে এতগুলো সংখ্যার লেখা প্রাপ্তি এবং পর্যায়ক্রমে প্রকাশ কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিন্তাচর্চার ক্ষেত্রে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। পরবর্তী বর্ষ থেকে কলেজ ম্যাগাজিন ১৯২১-২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বছরে পাঁচ সংখ্যা করে প্রকাশিত হয়েছে। এসময়ে অর্থাৎ ১৯২১-২২ শিক্ষাবর্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বছরে চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হবে— জুলাই, অক্টোবর, জানুয়ারী ও এপ্রিল মাসে (শর্মা, ৭২ : ২০০৭)। তখন থেকে ত্রৈমাসিক পত্রিকা রূপে প্রকাশিত হতে থাকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, টানা একুশবছর। ১৯১৭ থেকে ১৯৩৯ খ্রি. কালপর্বে (১৯৪০-১৯৫০ খ্রি. পর্যন্ত মুরারিচাঁদ কলেজ হতে কোনো ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়নি, তবে ১৯৪২ খ্রি. Murarichand College Golden Jubilee Volume I, I I & I I I প্রকাশিত হয়) প্রাপ্ত সংখ্যাসমূহে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে নিম্নলিখিত রচনাগুলো পাওয়া যায় যাতে সাতটি প্রবন্ধ ও রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি অনুবাদ রয়েছে।

সারণি-১. রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় মুরারিচাঁদ কলেজ হতে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রবিষয়ক রচনার শিরোনাম ও লেখকসূচি—

উপর্যুক্ত প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো যাতে মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রচর্চার স্বরূপ বুঝতে সহায়তা করে। ‘গীতাঞ্জলির বিশেষত্ব কোথায় ?’ প্রবন্ধটি যখন শ্রীযতীন্দ্রনাথ দত্ত রচনা করেন, তখন বঙ্গদেশে গীতাঞ্জলির সার্থকতা নিয়ে এক ধরনের সমালোচনা ও বিতর্ক চলছিল। মুরারিচাঁদ কলেজের ভূতপূর্ব ছাত্র শ্রীযতীন্দ্রনাথ দত্ত সেসময়ের বিরুদ্ধমত খণ্ডন করে গীতাঞ্জলি-র ভাবরসের গভীরতা ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তিনি লিখেন—

একটি কথা উঠিয়াছে গীতাঞ্জলিতে এমন কোন বিশেষ গুণ নাই যার বলে ইহা বাঙালার প্রাচীন ধর্মবিষয়ক বাক্যের সহিত একাশনে স্থান পাইতে পারে।…গীতাঞ্জলিতে ভক্তি তত উচ্চস্তরে উঠিতে পারে নাই। শ্রীযুক্ত বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ বাঙালার প্রসিদ্ধ সমালোচকগণও তুলনামূলক সমালোচনার সাহায্যে দেখাইয়াছেন রাধিকার প্রেমের নিকট গীতাঞ্জলির প্রেম দাঁড়াইতে পারে না। এখন কথা হইতেছে.. আমাদিগকে মনে রাখিতে হইবে রবীন্দ্রনাথ কোনও ধর্মগ্রন্থ প্রণয়নের নিমিত্ত বসেন নাই। তিনি তাহার তখনকার খাঁটি ভাবকে গানের ভিতর প্রকাশ করিয়াছেন। এদিকে তিনি সাফল্য লাভ করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠিক যে স্তরে উঠিয়া তাহার গীতাঞ্জলি প্রণয়ন করিয়াছেন তাহা প্রত্যেক গানেই প্রস্ফুটিত হইয়াছে। (দত্ত, ১৯২০ : ৫৭)

গীতাঞ্জলির বিশেষত্ব প্রসঙ্গে যতীন্দ্রনাথ দত্তের এ লেখাটির প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয় ১৯২০ – এর অক্টোবরে, কলেজ ম্যাগাজিনের চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় এবং দ্বিতীয় কিস্তি ঐ বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় (জানু. ১৯২১)। তাঁর মতে, গীতাঞ্জলি হচ্ছে—

সহজ সরল মনের এক সহজ বিকিরণ। কোনরূপ আচারের কর্দম সে চিত্তের উপর মলিনতা অঙ্কিত করিয়া দেয় নাই। কাজেই তাহার জ্যোতি অচিরে পাঠকের হৃদয়ে বিস্তারিত হইয়া পড়ে। এইখানেই গীতাঞ্জলির বিশেষত্ব। (দত্ত, ১৯২০ : ৫৮)

শ্রীদ্বারেশচন্দ্র শর্মাচার্য্য ১৯২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র এবং মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনের একাদশ বর্ষের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর ‘রবি – প্রশস্তি’ প্রবন্ধটিতে তিনি রবীন্দ্রকাব্যে একটি ‘মুক্তিতত্ত্ব’ রয়েছে বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যে প্রথাগত ‘বৈরাগ্য সাধনে’র মাধ্যমে মুক্তি কামনা করেননি। সমাজ ও ধর্মশাসিত জীবনের বিধি – নিষেধের নিগড়ে মানবচিত্তের মুক্তি আসে না, মুক্তি আসে অবাধ প্রাণের স্ফূরণে, অসংখ্য বন্ধন মাঝে। তাঁর মতে, এটিই রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তিতত্ত্ব’ এবং তার কাব্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই তত্ত্ব পাশ্চাত্যে কদর পেয়েছে। (শর্মাচার্য্য, ১৯২৭ : ৩৮)
১৯৩২-৩৩ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত মুরারিয়ান ফণীন্দ্রনাথ দত্ত সেসময় রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের রসবিচার করেছেন ‘চিত্রাঙ্গদা’ প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথের এ নাটকটিকে নিয়ে সমকালীন অনেকে ভোগবাদ ও নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছিলেন। ফণীন্দ্রনাথ দত্ত এরূপ সমালোচনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন

‘চিত্রাঙ্গদা’ হচ্ছে চরম আর্ট। টলষ্টয় আর্ট বলতে বুঝেন— (Transmition of feeling) । আর্টের কাজ হচ্ছে আমাদের কান্তিরসকে (Aesthetic Sentiment) তৃপ্ত করা এবং সেই হিসাবে চিত্রাঙ্গদা হচ্ছে চরম আর্ট। কাব্যর কাজ রস সৃষ্টি এবং চিত্রাঙ্গদা হচ্ছে চরম কাব্য। এই ভাব-ঘন-রসোচ্ছ্বাস না দৃষ্টি জগতের বিষয়বস্তুর রূপ-যোজনায়, না শব্দ জগতের মধুর রাগিনীতে, এ কল্পজগতের অনুভূতি লীলায় ধরা পড়েছে।.. কামনার সম্পূর্ণতাই প্রেম নয়, দেহকে আশ্রয় করে নর-নারীর ভালবাসা আপনাকে বিকাশ করতে চায়, তার পরিপূর্ণ প্রকাশ দেহাতীত আনন্দ মিলনেই শুধু ঘটে ভোগের পরিসমাপ্তি রেখায় সে প্রকৃতপ্রেম তার বিচিত্র রঙে তার বরণ-মালা আঁকা, এটাই চিত্রাঙ্গদার শেষ কথা। ( দত্ত, ১৯৩২ : ৮৫)

‘রবীন্দ্র-প্রতিভার যৎকিঞ্চিৎ’ প্রবন্ধটিতে রামেন্দ্রকুমার দেশমুখ্য রবীন্দ্রনাথের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ চিহ্নিত করে বলেছেন, ‘তাঁর কাব্যের সবচাইতে বড় কথাই হল—ছোট’র মধ্যে বড়কে দেখা। কবি প্রতিভার এতে মর্যাদা হানি হল না মোটেই, বরঞ্চ বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত হল এই জন্যে যে, সীমার মধ্যে অসীম ধরা পড়ল—ক্ষুদ্র’র মধ্যে বৃহৎ স্থিতি স্বীকার কল্ল’। এক্ষেত্রে তিনি তুলনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে গ্যাটে-কীট্স-ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ, ব্রাউনিং, এমারসন এবং লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির শিল্পকর্মের এবং বলেছেন, ভারতবর্ষের দর্শন ও চিন্তাধারাকে রবীন্দ্রনাথ নতুন পথে অগ্রসর করালেন। প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে রামেন্দ্রকুমার দেশমুখ্যের কীরকম প্রাগ্রসর চিন্তা ভাবনার পরিচয় ফুটে উঠেছে তা বিবেচনার জন্য নিচের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হল—

উনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে নীতিপ্রচার খুব বড় হয়েই ধরা পড়ে। সাহিত্যের সূক্ষ্ম রসটা নীতিপ্রচারে খুবই আঘাত পায়—সন্দেহ নেই। আর্টের পরিমণ্ডলে আগের যুগের কবিতাগুলি ঠিক তাই যেন তেমন করে স্থান পেল না। রবীন্দ্রনাথ শিল্পরসকে রাখলেন অব্যাহত— রচনায় দেখা দিল সুসঙ্গত সামঞ্জস্য অথচ নীতির মূলবাণীগুলোও যেন অস্বীকৃত হ’লনা। (দেশমুখ্য, ১৯৩৭ :৮৩)

রবীন্দ্রসাহিত্য সম্পর্কে মুরারিয়ানদের আরো দুটি মূল্যবান প্রবন্ধ হলো ‘রবীন্দ্রনাথের নারী’ এবং The Gift of Tagore। দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে রবীন কর এবং বিজিত চৌধুরী। মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রচর্চার অন্যরকম নজিরও রয়েছে সেকালের ম্যাগাজিন জুড়ে। তখন ‘নোট্স এন্ড নিউজ’ এবং সম্পাদকীয় রচনা করা হত ইংরেজিতে যাতে প্রায়শ রবীন্দ্রকবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা হত অবিকল। এমনকি ম্যাগাজিনের ‘নোটস ও নিউজ’ অংশে ১৯৩৬ খ্রি. কবির রোগমুক্তি কামনা করে তারবার্তা প্রেরণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় এবং কবির রোগমুক্তিতে পরবতীর্কালে ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয়তে নিম্নোক্ত আনন্দবার্তা জ্ঞাপন করা হয় :

God be thanked by His grace. Our poet has come round.The world nation, nay, the whole civilized world prayed for his recovery and the prayer has not in vain. (The Murarichand College Magazine. Vol. xx. no. i., 1937-38, Editorial, p., 47.)

তিন. ‘আলো ভুবন-ভরা’

রবীন্দ্রোত্তরকালে এই জনপদ ও মুরারিয়ানদের জীবনে যুক্ত হয়েছিল দেশভাগ ও ত্যাগ, পাকিস্তান সৃষ্টি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের মতো ঘটনাবলি। সাতচল্লিশ পরবর্তীকালে, পাকিস্তান সৃষ্টির পর, পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশক এমনকি আশির দশকেও অনেকটা বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যে মুরারিয়ানদের রবীন্দ্রচর্চা আরো বেগবান ও বহুমাত্রিক চরিত্র গ্রহণ করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এ দেশে রবীন্দ্রচর্চার প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকার পর্যায়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, কেউ কেউ সাস্প্রদায়িকতার প্রশ্নও উত্থাপন করেন। সেসময় বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন যেমন কমিউনিস্ট পার্টি ও প্রগতি লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠির কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে চিহ্নিত করলেন ‘প্রগতি বিরোধী বর্জুয়া হিসেবে’ এবং শাসক দল ঔপনিবেশিক প্রয়োজনে ‘রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত হল’। এ প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান লিখেছেন— 

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বড় রকম বিতর্ক দেখা দিল ১৯৬১ সালে। সারা বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের আয়োজন হচ্ছে কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা তা হতে দিতে চায় না…১৯৬৫ সালের পাকভারত যুদ্ধের সময়ে রেডিও পাকিস্তান এবং পাকিস্তান টেলিভিশন থেকে ‘ভারতীয় উৎসে’র সাংস্কৃতিক পণ্যের প্রচার রহিত হয়। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম পড়ে যায় ওই শ্রেণিতে। যুদ্ধ শেষ হলে একটু একটু করে রবীন্দ্র সংগীত ফিরে আসতে থাকে প্রচার মাধ্যমে। এই সময়ে, ১৯৬৭ সালের জুন মাসে পকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবউদ্দীন জাতীয় পরিষদকে জানান যে, রবীন্দ্রনাথের যেসব গান পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী, বেতার ও টেলিভিশন থেকে তার প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য গানের প্রচারও ক্রমশ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। (আনিসুজ্জামান, ২০১১ : ?)

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা, সংস্কৃতিকর্মী এবং প্রথম সারির পত্র – পত্রিকার অবস্থান ছিল পক্ষে-বিপক্ষে। (মকসুদ, ২০০৭ : ৬৯) এই বিতর্কে বিশিষ্ট মুরারিয়ানরা নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন।

মুরারিচাঁদ কলেজের ভূতপূর্ব ছাত্র সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১৯৫১- ) এই বিতর্কে রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে আহমদ শরীফের প্রবন্ধের প্রতিবাদে উত্তরাধিকার—এ লিখিত প্রবন্ধে অভিমত ব্যক্ত করেন :

ব্যক্তিগত জীবন নয়, শিল্পই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়। সমাজতন্ত্রী বা সমাজ সংস্কারক না হওয়ায় কিংবা ভারতে মুসলিম শাসনের প্রসঙ্গ না-আনায় অথবা বিংশ শতাব্দীর মনোভাব আয়ত্ত না করায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের কী ক্ষতি হয়েছে, আহমদ শরীফ তা দেখান নি।’(উদ্ধৃত, আনিসু্জ্জামান, ২০১১ : ?)

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৯৬৭-৬৮ সালে মুরারিচাঁদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ছিলেন, কলেজ ম্যাগাজিনের প্রাপ্ত কোনো সংখ্যায় তাঁর কোনো রচনা দৃষ্টিগোচর হয় নি। তবে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ (২০১১) গ্রন্থভুক্ত তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ সাহিত্য’ প্রবন্ধটি প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে উল্লেখ করা যায়। এতে বিশ্বের পটভূমিতে পর্যটক রবীন্দ্রনাথের স্বদেশচিন্তা বিশ্লেষণ করেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথের য়ূরোপপ্রবাসীর পত্র (১৮৮১), রাশিয়ার চিঠি (১৯১৯), পারস্যে (১৯১৯), যাভাযাত্রীর পত্র, পশ্চিম যাত্রীর ডায়রি, জাপান যাত্রী (১৯৩১) প্রভৃতি গ্রন্থ এবং বিপুলসংখ্যক চিঠিপত্র ভ্রমণ সাহিত্যের অন্তর্গত। এসব গ্রন্থে নিছক ভ্রমণকাহিনির বদলে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের অন্তর্দৃষ্টি ও কল্যাণকামী চিন্তাধারার বিশিষ্টতার পরিচয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বিদেশে যতোবারই গিয়েছেন ততোবারই ভারতের বর্তমানকে বিচার করেছেন নির্বস্তুক মোহমুক্ত দৃষ্টিতে বিদেশের পটভূমিতে, চিহ্নিত করেছেন স্বদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ যতবারই বিদেশ গিয়েছেন ‘দেশকে দেখেছেন বিশ্বের প্রেক্ষিতে, বিশ্বকে দেশের’। (ইসলাম, ২০১১ : ৮৮)

পাকিস্তান সৃষ্টির পরবতীর্ কালে রবীন্দ্রবিতর্কের আবহের ছাপ মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনের কোথাও পড়েনি বা কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে পৌঁছায়নি। রবীন্দ্রনাথের আগমনকে যেমন সিলেটবাসী হিন্দু-মুসলিম জনসাধারণ ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘নারায়ে তকবির’ বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, তেমনি পরবতীর্কালেও কোনো খণ্ডিত চিন্তা করেনি। সমকালীন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত রচনাবলিতে অন্তত সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিজাত কোনোরূপ বিচার বিশ্লেষণও চোখে পড়েনি। রবীন্দ্রসাহিত্যের বিচার-বিশ্লেষণ থেমে থাকেনি, নান্দনিকতাই ছিল তখনকার বিচারের মাপকাঠি। পাকিস্তান আমল থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত রবীন্দ্রবিষয়ক রচনা এগারোটি, এগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিস্কার হবে। নিচের ছকে রবীন্দ্রবিষয়ক রচনার শিরোনাম দেখানো হলো— 

সারণি-২. * চিহ্নিত সময়কালে মুরারিচাঁদ কলেজের নামের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে।
দেশভাগের পর মুরারিচাঁদ কলেজ হতে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রবিষয়ক রচনার শিরোনাম ও লেখকসূচি

উপরের সবকটি রচনার বিষয়বস্তু রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যজীবন ও দর্শন— তাঁর রচনাবলি বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস এবং সংগীতে বিবৃত প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, রোমান্টিকতা, মরমীচিন্তার বিশেষত্ব নির্ণয়। ‘মাতৃভাষায় রবীন্দ্রনাথের দান’, ‘রবীন্দ্রকাব্যে বৈষ্ণব প্রভাব’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘রবীন্দ্রকাব্যে বর্ষা’, ‘রবীন্দ্রকাব্যে প্রেম, সৌন্দর্য ও সাধারণ মানুষ’, ‘রবীন্দ্রকাব্যে দেশকাল’, ‘রবীন্দ্রসংগীতে বাউল প্রভাব’, ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে লোকজ ঐতিহ্য’ প্রবন্ধগুলোতে সামগ্রিক দিক থেকে রবীন্দ্রকাব্য বিশ্লেষণের প্রয়াস দেখা যায়। ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধটিতে দেখানো হয়েছে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। সুধীরচন্দ্র পাল ‘রবীন্দ্রকাব্যে বৈষ্ণব প্রভাব’ প্রবন্ধে কবির ব্রহ্মচিন্তা এবং প্রেমের স্বরূপ নির্ণয়ে যে পরিণত চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন তা কিছুটা উদ্ধৃত হলো :

রবীন্দ্রনাথ বিরচিত গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, গীতপঞ্চাশিকা, প্রভৃতি গ্রন্থে বৈষ্ণব প্রভাব সম্যকরূপে নিপতিত হয়েছে। খেয়া, গীতিমাল্য, গীতাঞ্জলির যুগকে রবীন্দ্রকাব্যের ইতিহাসে ভগবদ রসলীলা যুগ বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মবাদী, তাঁহার ভগবান কখনো অসীম, অনন্ত, কখনো পরম প্রিয়তম, কখনো সর্বহারা দরিদ্রদের মধ্যে তাঁহার চরণ, কখনো প্রকৃতি ও মানবের মধ্যে বহু রূপে প্রকাশিত হইলেও অরূপ, সর্বদা চঞ্চল, চির বিচিত্র, অনন্ত লীলা রস রসিক। তিনি মূর্তি নিরপেক্ষ, সাধন নিরপেক্ষ, বৈষ্ণব লীলা তত্ত্বের মূল তত্ত্বটুকু কেবল গ্রহণ করিয়াছেন। (পাল, ১৯৬৯ : ২৩)

‘মাতৃভাষায় রবীন্দ্রনাথের দান’ প্রবন্ধে আব্দুর রহিম রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস এবং সংগীত বিশেষত স্বদেশী গানের ভাবপ্রবাহকে স্বল্পায়তনে বেঁধেছেন রবীন্দ্রবিতর্কের কালে, এটি একটি মূল্যবান বিষয়। রবীন্দ্রসাহিত্যে বাংলার বাউলদর্শন প্রসঙ্গে আবুল বশর  তাঁর ‘রবীন্দ্রসংগীতে বাউল প্রভাব’ প্রবন্ধে বলেছেন যে, ‘রবীন্দ্রনাথ লোকায়ত বাংলার দেশীয় সংগীত থেকে প্রাণরস আহরণ করেছেন’। (বশর, ১৯৭৮ : ৪০) বস্তুত রবীন্দ্রকাব্য ও সংগীতে বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্য অন্ত:সলিলার মতোই প্রবাহিত। ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে লোকজ ঐতিহ্য’ প্রবন্ধে সফিউদ্দিন আহমদ রবীন্দ্রসাহিত্যে মাটি ও মানুষের উত্তাপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। জফির সেতু  এবং আজির হাসিবের  প্রবন্ধ স্বতন্ত্র বিষয়ভিত্তিক গবেষণামূলক রচনা যাতে রবীন্দ্রজীবনে নির্দিষ্ট সাহিত্যকর্মের স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা লক্ষযোগ্য। জফির সেতুর ‘কালের দ্বৈরথ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘হৈমন্তী’কে নীরিক্ষণ করা হয়েছে উনিশ ও বিশ শতকীয় সমাজতাত্ত্বিক পটভূমিতে এবং ‘রবীন্দ্রমানসে মীরা-নগেন্দ্রনাথ দাম্পত্যসংকট’ প্রবন্ধে আজির হাসিব বিশ্লেষণ করেছেন কবির জীবনে কন্যা মীরা দেবী এবং জামাতা নগেন্দ্রনাথের দাম্পত্য সংকটের প্রভাব। তবে মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা কিংবা শিক্ষাচিন্তা বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রবন্ধ দৃষ্টিগোচর হয়নি। সিলেট ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ শ্রীহট্টকে ‘সুন্দরী’ ও ‘শ্রীভূমি’ হিসাবে আখ্যায়িত করে কবিতা রচনা করেন; বঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্নকরণের ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময়ী শ্রীহট্টকে ‘নির্বাসিতা’ বলে উল্লেখ করে সমাজ-রাষ্ট্রের কূটচাল এবং সিলেটের নিদারুণ নিয়তির প্রতি ইঙ্গিত করেন— শতাব্দীকালের এই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই অনুধাবন ও উৎসারণের বিষয়টি মুরারিয়ানদের নিকট আজ পর্যন্ত দূর্জ্ঞেয় থেকে গিয়েছে।

চার. ‘ঘাটে বাঁধা তরী’

উপরের আলোচনার বাইরেও মুরারিয়ানদের গুরুত্বপূর্ণ রচনা থাকা সম্ভব। কারণ মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিনের সবগুলো সংখ্যা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ’৪৭ পরবতীর্কালে ম্যাগাজিন প্রকাশনায় শ্লথগতির জন্য রবীন্দ্রচর্চায় বেশ ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়। তবু এটুকু বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের আগমন পরবতীর্কালে মুরারিয়ানরা কবির সৃষ্টিকর্মকে নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা বিশ্লেষণে সর্বোতভাবে প্রবৃত্ত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রেম, প্রকৃতিচেতনা, রোমান্টিকতা, মরমীচিন্তা, মৃত্যুচিন্তা, লোকায়ত জীবনবোধ তাঁদের চিত্তলোক পরিপূর্ণ করেছে এবং চিন্তালোকে সঞ্চারিত করেছে আলোকধারা। ভারতীয় জীবনদর্শন— প্রকৃতি ও মানবিকবোধসমূহ সমাজ-সংস্কৃতির পটভূমিতে জারিত হয়েই রবীন্দ্রনাথের কবিমানস তৈরি হয়েছিল। মুরারিয়ানরা এই রবীন্দ্রনাথকে শুধু আত্মস্থ করেননি, তাঁকে ছড়িয়ে দিয়েছেন লোকান্তরে। কবিকে বিচার করেছেন তাঁরা কাব্যধর্মের আলোকে, সমাজধর্ম বা যুগের উত্তাপকে প্রশ্রয় দেননি। বরং নানাভাবে যখন রবীন্দ্রনাথকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে, তখন মুরারিয়ানরা তাঁর রচনার শৈল্পিক সৌন্দর্য বিশ্লেষণ করে রচনার মহত্বকে নির্দেশ করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যখন রবীন্দ্ররচনাকে সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে ডান কিংবা বাম ঘরনার কোনো কোনো পণ্ডিত সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়েছেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতো মুরারিয়ান তখন রবীন্দ্রনাথের শিল্পসুষমাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। কবি রবীন্দ্রনাথের ভাবলোক, কবিতার ভাষা ও ছন্দ নির্মাণ কৌশল, ছোটগল্প-নাটক-উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের সমাজসংলগ্নতা এবং সঙ্গীতের ভাবপ্রবাহকে তাঁরা বিশ্লেষণ করেছেন শিল্পতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা বা শিক্ষাচিন্তা অথবা সমকালীন রবীন্দ্রবিতর্কের ক্ষেত্রে মুরারিয়ানরা কলেজ ম্যাগাজিনে নীরব থেকেছেন, কোনোরূপ খণ্ডিত বিশ্লেষণ করেননি। বরং রবীন্দ্রনাথের জীবনবীক্ষা ও শিল্পদৃষ্টি তাঁদের মানসলোককে উজ্জীবিত করেছে এবং শতাব্দীকাল ধরে ‘শ্রীভূমি’ খ্যাত এই প্রান্তিক জনপদে আলোক সঞ্চার করে চলেছে।

তথ্য-নির্দেশ

আলী, সৈয়দ মোস্তফা (১৩৭১ ব.)। আত্মকথা। আল ইসলাহ্।  সম্পা. মুহম্মদ নূরুল হক, ফাল্গুন, ১৩৭১ ব., ৩৩শ বর্ষ, ১১ শ সংখ্যা;

আহমদ, সফিউদ্দিন (১৯৮১)। পূর্বাশা।  সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বার্ষিকী১৯৮১। সম্পা. সফিউদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য;

আহসান, সৈয়দ আলী ( ১৯৭৪)। রবীন্দ্রনাথ:কাব্য বিচারের ভূমিকা।  ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস;

আনিসু্জ্জামান (২০১১)। রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ। কালি ও কলম : রবীন্দ্র সার্ধজন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা। সম্পা. আবুল হাসনাত;

আজিজ, আব্দুল (২০১৪)। মুরারিচাঁদ কলেজের ইতিকথা। চৈতন্য : সিলেট;

আজিজ, আব্দুল (১৯৭৮)। সিলেট সরকারী কলেজের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী – ১৯৭৮ সম্পা. সম্পাদনা পর্ষদ;

ইকবাল, ভূইয়া (১৯৯৩)। বাংলাদেশে রবীন্দ্র-সংবর্ধনা। ঢাকা : বাংলা একাডেমি;

ইসলাম, সৈয়দ মনজুরুল (২০১১)। রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ। সংক.ও সম্পা. মোবারক হোসেন। ঢাকা : বাংলা একাডেমি;

কর, রবীন (১৯৩৭)। রবীন্দ্রনাথের নারী। The Murarichand College Magazine, vol.xx. no. ii. 1937-38, ১৯৩৭ – ৩৮, সম্পা. মন্মথ রঞ্জন চৌধুরী ;

চক্রবর্তী , বীরেশ (১৯৭৬)। রবীন্দ্রকাব্যে প্রেম, সৌন্দর্য ও সাধারণ মানুষ। পূর্বাশা।  সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী – ১৯৭৬। সম্পা. আবুল বশর ও বীরেশ চক্রবর্তী;

চৌধুরী, শাশ্বতী পাল (১৯৭০)। ‘আমি তোমাদেরই লোক’। সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী—১৯৭০। সম্পা. মুহম্মদ কলন্দর আলী;

দত্ত, ফণীন্দ্রনাথ (১৯৩২)। চিত্রাঙ্গদা। The Murarichand College Magazine, vol. xiv.no. ii., 1932-33, ১৯৩২ – ৩৩, সম্পা. অমিয়াংশু এন্দ ;

দত্ত, যতীন্দ্রনাথ (১৯২০)। গীতাঞ্জলির বিশেষত্ব কোথায়? The Murarichand College Magazine, vol. iv. no. ii., 1920-21, , ১৯২০ – ২১, সম্পা. ভি চক্রবতীর্ ও অন্যান্য;

দাশ, নৃপেন্দ্রলাল (১৯৯২)। শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ। ঢাকা : মুক্তধারা;

দাস,স্বপ্না (১৯৭০)। রবীন্দ্রকাব্যে বর্ষা। সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী—১৯৭০। সম্পা. মুহম্মদ কলন্দর আলী;

দেশমুখ্য, রামেন্দ্রকুমার (১৯৩৭)। রবীন্দ্র – প্রতিভার যৎকিঞ্চিৎ। The Murarichand College Magazine, vol. xx. no. ii, সম্পা. মন্মথ রঞ্জন চৌধুরী;

পাল, সুধীরচন্দ্র (১৯৬৯)। রবীন্দ্রকাব্যে বৈষ্ণব প্রভাব। ঝরনা । সিলেট সরকারী কলেজ বার্ষিকী – ১৯৬৮ – ৬৯, সম্পা. আবু হোসেন;

বশর, আবুল (১৯৭৭)। রবীন্দ্রকাব্যে দেশকাল। পূর্বাশা, সিলেট সরকারী কলেজ বার্ষিকী – ১৯৭৭। সম্পা. অধ্যাপক আবুল বশর ও আয়েশা খাতুন;

বশর, আবুল (১৯৭৮)। রবীন্দ্রসংগীতে বাউল প্রভাব। পূর্বাশা। সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী -১৯৭৮, সম্পা. আবুল বশর ও আমির আলী চৌধুরী;

ভট্টাচার্য্য, রাধানন্দ (২০০২)। রবীন্দ্রনাথ ও পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব। কবি প্রণাম। সম্পা. নলিনীকুমার ভদ্র, অমিয়াংশু এন্দ, মৃণালকান্তি দাশ, সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ। শ্রীহট্ট : বাণীচক্র-ভবন;

মকসুদ, আবুল (২০০৭)। পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ। ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স;

রহিম, আব্দুর (১৯৫৮)। মাতৃভাষায় রবীন্দ্রনাথের দান। মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী—১৯৫৮, সম্পা. দেওয়ান নূরুল হোসেন;

রায়, নীহাররঞ্জন (১৩৪৮)। রবীন্দ্র – সাহিত্যের ভূমিকা । কলিকাতা : কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়;

রাহা, অশোক বিজয় (২০১৩)। প্রবন্ধসংগ্রহ : অশোকবিজয় রাহা । সংক.ও সম্পা. অমল পাল। কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ;

রায়, পান্না রাণী (২০১৬)। রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন। পূর্বাশা, মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী – ২০১৬। সম্পা. আবুল আনাম মো. রিয়াজ ও অন্যান্য;

শমার্চার্য্য, দ্বারেশচন্দ্র (১৯২৭ )। রবি – প্রশস্তি। The Murarichand College Magazine, vol. xi. no. ii., , ১৯২৭ – ২৮, সম্পা. শ্রীদ্বারেশচন্দ্র শর্মাচার্য্য;

শর্মা, নন্দলাল (২০০৭)। মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী : বৃটিশপর্ব। পূর্বাশা। মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী – ২০০৭, সম্পা. আশফাক আহমদ ও অন্যান্য;

সিংহ, সুধীরেন্দ্রনারায়ণ (২০০২)। শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ। কবি প্রণাম। সম্পা. নলিনীকুমার ভদ্র, অমিয়াংশু এন্দ, মৃণালকান্তি দাশ, সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ। শ্রীহট্ট : বাণীচক্র-ভবন;

সেতু, জফির (২০০৭)। কালের দ্বৈরথ। পূর্বাশা। মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী – ২০০৭। সম্পা. আশফাক আহমদ ও অন্যান্য;

হাসিব, আজির (২০০৭)। রবীন্দ্রমানসে মীরা-নগেন্দ্রনাথ দাম্পত্যসংকট। পূর্বাশা। মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী-২০০৭। সম্পা. আশফাক আহমদ ও অন্যান্য;

সহায়ক গ্রন্থাবলি

অশোকবিজয় রাহা (২০১৩)। প্রবন্ধসংগ্রহ । সংক.ও সম্পা. অমল পাল। কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ;
আব্দুল আজিজ (২০১৪)। মুরারিচাঁদ কলেজের ইতিকথা । চৈতন্য : সিলেট;
আকবর আলী খান (২০১৯)। দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে । ঢাকা : প্রথমা;
আবু সয়ীদ আইয়ুব (২০০৯)। আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ। কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং;
আল ইসলাহ্। সম্পা. মুহম্মদ নূরুল হক, ফাল্গুন, ১৩৭১ ব., ৩৩শ বর্ষ, ১১ শ সংখ্যা;
উষারঞ্জন ভট্টাচার্য (২০১৮)। শ্রীহট্ট-কাছাড় : মনীষী, মনীষা ও অন্যান্য। কলকাতা ; অক্ষর পাবলিকেশন্স্
কবি প্রণাম । সম্পা. নলিনীকুমার ভদ্র, অমিয়াংশু এন্দ, মৃণালকান্তি দাশ, সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ। শ্রীহট্ট : বাণীচক্র-ভবন;
কালি ও কলম : রবীন্দ্র সার্ধজন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা। সম্পা. আবুল হাসনাত;
ঝরনা ।  সিলেট সরকারী কলেজ বার্ষিকী – ১৯৬৮-৬৯, সম্পা. আবু হোসেন
নন্দলাল শর্মা (২০০৯)। সিলেটের সাহিত্য : স্রষ্টা ও সৃষ্টি । সিলেট : মাহমুদ কম্পিউটার্স;
নীহাররঞ্জন রায় (১৩৪৮)। রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভূমিকা । কলিকাতা : কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়;
প্রমথনাথ বিশী (১৪০৪)। রবীন্দ্রকাব্যপ্রবাহ । কলকাতা : মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.;
পূর্বাশা, সিলেট সরকারী কলেজ বার্ষিকী-১৯৭৭। সম্পা. অধ্যাপক আবুল বশর ও আয়েশা খাতুন;
পূর্বাশা।  সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী-১৯৭৮, সম্পা. আবুল বশর ও আমির আলী চৌধুরী;
পূর্বাশা।  সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বার্ষিকী-১৯৮১। সম্পা. সফিউদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য;
পূর্বাশা, মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী-২০০৭। সম্পা. আশফাক আহমদ ও অন্যান্য;
পূর্বাশা, মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী-২০১৬। সম্পা. আবুল আনাম মো. রিয়াজ ও অন্যান্য;
মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী-১৯৫৮, সম্পা. দেওয়ান নূরুল হোসেন;
বুদ্ধদেব বসু (১৩৮৯)। রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য । কলকাতা : নিউ এজ পাবলিশার্স প্রা. লি.;
ভূইয়া ইকবাল (১৯৯৩)। বাংলাদেশে রবীন্দ্র -সংবর্ধনা। ঢাকা : বাংলা একাডেমি;
সৈয়দ মুজতবা আলী (১৩৯১)। গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন।  কলিকাতা : মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি;
মৈত্রেয়ী দেবী (২০১৫)। কুটিরবাসী রবীন্দ্রনাথ।  ঢাকা : মুক্তধারা;
রবীন্দ্রনাথ (২০১১)। সংক.ও সম্পা. মোবারক হোসেন। ঢাকা : বাংলা একাডেমি;
সিলেট সরকারী মহাবিদ্যালয় বার্ষিকী – ১৯৭০। সম্পা. মুহম্মদ কলন্দর আলী;
সৈয়দ আকরম হোসেন (১৩৮৮)। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : চেতনালোক ও শিল্পরূপ। ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
সৈয়দ আলী আহসান ( ১৯৭৪)। রবীন্দ্রনাথ : কাব্য বিচারের ভূমিকা। ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস;
হায়াৎ মামুদ (১৯৮৯)। ভ্রমি বিস্ময়ে।  ঢাকা : বাংলা একাডেমি;
হুমায়ুন আজাদ (১৯৯৯)। রবীন্দ্রপ্রবন্ধ : রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা।  ঢাকা : আগামী প্রকাশনী ;

The Murarichand College Magazine Vol. iv. no. ii, 1920-21, সম্পাদনা পর্ষদ : ভি চক্রবতীর্, এস সি সেন, এন এম শাস্ত্রী, এস এন চ্যটার্জি, পি সি স্যানাল, এস এম চক্রবর্তী ও এস এন প্রধান; 

The Murarichand College Magazine Vol. iv. no. iii., 1920-21, সম্পাদনা পর্ষদ : ভি চক্রবতীর্, এস সি সেন, এন এম শাস্ত্রী, এস এন চ্যটার্জি,পি সি স্যানাল, এস এম চক্রবর্তী ও এস এন প্রধান; 

The Murarichand College Magazine, Vol. xi. no. ii., 1927-28, সম্পাদনা. শ্রীদ্বারেশচন্দ্র শর্মাচার্য্য; 
The Murarichand College Magazine, Vol. xiv. no. ii., 1932-33, সম্পা. অমিয়াংশু এন্দ;
The Murarichand College Magazine, Vol. xiv. no. i., 1934-35, Editor: Shamsuddin Ahmed;
The Murarichand College Magazine, Vol. xx. no. ii,. 1937-38, মন্মথ রঞ্জন চৌধুরী;
The Murarichand College Magazine, Vol. xx. no. ii., 1937-38, মন্মথ রঞ্জন চৌধুরী;
The Murarichand College Magazine, Vol. xxi. no. i., 1934-35, Editor. Diren Sen

মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে রবীন্দ্রনাথের আগমনের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ৬ নভেম্বর ২০১৯-এ অনুষ্ঠিত সেমিনার ও নানা আয়োজনের কিছু ছবি নিচে দেয়া হলো …

সম্পাদক: মিজান রহমান
প্রকাশক: বিএসএন মিডিয়া, এডিনবরা, স্কটল্যাণ্ড থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: