বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আমাদের ওয়েবসাইটে স্বাগতম (পরীক্ষামুলক স¤প্রচার)

স্কটল্যান্ডে করোনা ভাইরাস (বিস্তারিত)

কথাশিল্পী মহাশ্বেতা দেবীর সান্নিধ্যে একটি সকাল …




হুমায়ুন কবির ( এডিনবরা, ২৮ জুলাই ২০২০ )

২০১৬ সালের ২৮ জুলাই মৃত্যু বরণ করেছেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী মহাশ্বেতা দেবী। চার বছর পর আবার আজ সেই দিন, ২৮ জুলাই। ওনাকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করেছিলাম তখন। স্কট বাংলার সম্পাদক মিজান ভাই প্রায়ই পরামর্শ দেন লেখার চর্চা অব‍্যাহত রাখার জন‍্য। কিন্তু আলসেমির কারনে প্রায়ই হয়ে ওঠে না। ওনাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের কিছু অংশ আবারও প্রকাশ করছি স্কটবাংলা পোর্টালে তার এই প্রয়াণ বার্ষিকীতে।

২০১৬ সালের ২৮ জুলাই মহাশ্বেতা দেবী মৃত্যুবরণ করেন, ৯০ বছর বয়সে। প্রকৃতির বিধানেই চলে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে হয় এই বয়সে সব মানুষকেই, তারপরেও মেনে নিতে ইচ্ছে হয় না। প্রিয়জন আর এইসব কিংবদন্তী মানুষের চলে যাওয়া একেবারেই মেনে নিতে ইচ্ছে হয় না, সে বয়স নব্বই হোক কিংবা নয়শ হোক। সম্ভবত অসম্ভবকে নিয়েই মানুষ বেশি ভাবে। অসাধ‍্যকে সাধনের প্রচেষ্টায় ধ‍্যানমগ্ন থাকে মানবজাতি অধিকাংশ সময়। সুতরাং ভাবতে এবং চাইতে দোষ কি, প্রকৃতির কিছু নিয়ম ওলট-পালট হয়ে হাজার হাজার বছরের আয়ু হোক ‘অগ্নিগর্ভ-হাজার চুরাশীর মা-চোট্টি মুন্ডা’র স্রষ্টারা আর আমাদের প্রিয়জনের। শুনেছি হাজার হাজার বছর আগে মানুষের আয়ু ছিল শত শত বছর। অতীতে হতে পারলে ভবিষ্যতে হতেই বা দোষ কোথায়! প্রিয়জনের দীর্ঘায়ু কে না চায়!

সালটি সঠিক মনে নেই, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল তার উপন্যাস ‘চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর’। তার কোন উপন্যাস আমার এই প্রথম পড়ার সৌভাগ্য। যদিও অরণ্যের অধিকার, অগ্নিগর্ভ, হাজার চুরাশির মা আরও আগে বেরিয়েছিল, কিন্তু সেগুলি পড়ার সুযোগ আমার তখনও হয়নি। ‘চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর’ উপন্যাসটি পড়ে তার প্রতি আমার প্রথম ভাল লাগা। তখন অনলাইনের যুগ ছিল না। গল্প কবিতা উপন‍্যাস পাঠের একমাএ মাধ্যম ছিল প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা সরাসরি মুদ্রিত বই। এরপর খুঁজে খুঁজে তার অনেকগুলি উপন্যাস পড়ে ফেললাম। ভাল লাগা থেকে তার ভক্ত হয়ে গেলাম খুব দ্রুত। সমাজের নানা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েই তিনি লিখেছেন। তবে আদিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে লেখা আর তাদের অধিকার নিয়ে আজীবন সংগ্রাম করার কারণেই মূলত আমি তার গভীর ভক্ত হয়েছিলাম। আর তাই তার আগের উপন্যাসগুলি পড়ার পরও ওই ‘চোট্টি মুন্ডা আর তার তীর’ই আমার প্রিয় উপন্যাসের যায়গায় ছিল। আমি সেকথা মহাশ্বেতা দেবীকে বলেছিলামও। তিনিও বলেছেন, মুন্ডা চরিত্রটি তার একেবারেই কাল্পনিক সৃষ্টি এবং তারও একটি প্রিয় চরিত্র।

ফ্রাঙ্ক ফোর্টে অনুষ্ঠিত ৩৮ তম বইমেলায় মহাশ্বেতা দেবী (ছবি কৃতজ্ঞতা : তামজিদুল ইসলাম )

১৯৮৬ সালে যখন শুনলাম তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আসছেন, ভাবলাম তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কোনভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না, আর সুযোগ পেলে বা অনুমতি পেলে একটা সাক্ষাৎকারও নিতে হবে। কিন্তু জার্মানির হোমরাচোমরা টেলিভিশন চ্যানেলের বড় বড় ক্যামেরাগুলি এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে সেই যে তার পিছনে সারাক্ষণ যেভাবে লেগে ছিল, আমাদের মত আনকোড়া সাংবাদিকদের তার ধারে কাছে ভিড়তে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। প্রথমদিন ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দর থেকেই ওনাকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম, কিন্তু প্রথমদিন কথা বলার প্রচেষ্টা ব‍্যর্থ হলো। কিন্তু পরেরদিন বই মেলায় কাছে ভেড়ার কিঞ্চিৎ সুযোগ পেয়েই বলে ফেললাম, দিদি সময় বের করে আমাকে কিন্তু একটা ইন্টার্ভিউ দিতে হবে। আমি তখন লন্ডনের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার জার্মান প্রতিনিধি। অনেক ভিনদেশী ভাষার মধ‍্যে হঠাৎ বাংলা ভাষা আর দিদি সম্বোধন শুনে তিনি সম্ভবত একটু চমকে গেলেন। বিশ্বে নিয়মিত প্রকাশিত বই-পুস্তকের সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় প্রত্যেক বছর ফ্রাঙ্কফুর্টের এই বইমেলায়। সে এক এলাহি কাণ্ড। ভিড়ও হয় রীতিমত কুল কিনারা ছাপিয়ে। এই মহাব‍্যস্ত ভিড়ের মধ্যে আমার দিকে তাকালেন। দ্রুত আমাকে দু’তিনটে প্রশ্ন করে আমার সম্পর্কে অল্প কিছু জেনে নিয়ে কি ভেবে রাজী হয়ে গেলেন। বললেন, আজতো আমার হাতে একদম সময় নেই, কাল এসো। পরের দিন সাত-সকালে নির্ধারিত সময়ের আগে গিয়েই হাজির হলাম বইমেলার নির্দিষ্ট স্টলে- আনন্দ পাবলিশার্স। তিনিও এলেন ঠিক সময় মতই। আগের দিনই জেনে নিয়েছিলেন, আমি বাংলাদেশের মানুষ। আগের দিন তাকে কিছুটা গুরু-গম্ভীর স্বভাবের মানুষ মনে হলেও পরের দিন দেখলাম একেবারেই উল্টো। আমি একেবারেই একজন নবীন সাংবাদিক। কিন্তু তিনি খোশ গল্পে আমাকে এতটাই মাতিয়ে রাখলেন যে নিজেকে সেদিন আমার একবারও মনে হয়নি কিংবা তিনি আমাকে মনে করতে দেননি যে সাংবাদিকতায় আমি নবীন। ইন্টার্ভিউর চেয়ে আলাপচারিতাই বেশী হোল। খুঁটে খুঁটে বাংলাদেশের অনেক কিছুই জানতে চাইলেন।

অনেক পত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিকের নামই তার জানা। অনেকের খোঁজ-খবর নিলেন তিনি। বাংলাদেশ নিয়ে তার ছিল খুব আগ্রহ। বাংলাদেশের প্রতি ছিল তার গভীর স্রদ্ধা। ওইদিনই আমি প্রথম জানলাম তার জন্ম বাংলাদেশে ঢাকায়। ওইদিন এও জানলাম বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক তার ছোট কাকা। সত্যজিৎ রায় আর মৃণাল সেনের সিনেমা নিয়ে লেখালেখি কিংবা আলোচনা বেশী হলেও ঋত্বিক ঘটকের সিনেমাগুলি আমার বেশী ভাল লাগতো। ভেবে অবাক হলাম যেহেতু জানা ছিল না, ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝিও আবার এই মহাশ্বেতা দেবী! বললাম, আপনার কাকার সাথে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য তো আর কখনো হোল না! কিন্তু আপনার সাথে দেখা হয়ে কিছুটা হলেও তা পুরণ হলো। ঠোঁটের কোণায় একটা মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠলো! তবে বেদনার কিছুটা মিশ্রণও লক্ষ‍্য করলাম সেই হাসিতে। একটু আনমনা হয়ে বললেন, ঋত্বিক ঘটক তার ছোট কাকা হওয়ায় খুব কাছাকাছি বয়সের ছিলেন তারা। কাকা ভাইঝির মধ্যে ঘনিষ্ঠতাও ছিল বেশ। তাদের সম্পর্কের কয়েকটি মধুর স্মৃতিও উল্লেখ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের জন্য তিনি অতীতে হারিয়ে গেলেন। এত শত ব‍্যস্ততার মধ‍্যেও তিনি আমাকে অনেকক্ষণ সময় দিলেন। আলাপচারিতা শেষ হওয়ার পর বললেন, সাক্ষাৎকারের একটা কপি যেন মনে করে তাকে কোলকাতায় অবশ্যই পাঠাই। কোলকাতার ঠিকানা লিখে দিলেন। আবার মনে করিয়ে দিলেন, কবি বিজয়া মুখপধ্যায়কেও একটা কপি পাঠাতে যেন ভুল না করি, কারণ কবি বিজয়ারও একটা ইন্টার্ভিউ আগেই করেছিলাম এবং তাকে তা বলেছিলাম। আমাদের সাপ্তাহিক পত্রিকা। সাক্ষাৎকার ছাপা হওয়ার আগেই তিনি কোলকাতায় ফিরে গেছেন। কপি পাঠাতে মোটেই দেরী করলাম না। তখন তো এসব ইমেইল ফেসবুক কিছুই ছিল না, কোন ফ্যাক্সও আবিষ্কার হয়নি। সব যোগাযোগই ছিল ডাক এর মাধ্যমে। ডাক পাওয়ার পর খুব খুশী হয়ে কয়েকদিনের মধ্যে উত্তরও এসে হাজির। প্রথম চিঠিতেই লিখলেন, তোমরা যে কি করে এভাবে বিদেশ করো, আমিতো তোমাদের ওখানে কয়েকদিনেই হাপিয়ে উঠেছিলাম। এরপর অনেকদিন নিয়মিত চিঠির যোগাযোগ ছিল আমাদের। মাত্র একদিনের পরিচয়ে মহাশ্বেতা দেবীর সাথে এভাবে চিঠি পত্রের যোগাযোগ তৈরি হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি। সেই চিঠিগুলি এখনও সযত্নে রেখে দিয়েছি। এই বহু বছরে ইউরোপ আর এশিয়ায় কতইনা দেশ-দেশান্তরী হয়েছি, কিন্তু মহাশ্বেতা দেবীর চিঠিগুলি আমি নষ্ট হতে দেইনি। কারণ কুসংস্কার-আবর্জনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করার ব্রত নিয়ে পৃথিবীতে মহাশ্বেতা দেবীরা বারবার আসে না। হাজার কিংবা শত বছর পর মাঝে মধ‍্যে আসে এই হাজার চুরাশির মা !

লেখক হুমায়ুন কবির বতর্মানে স্কটল‍্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায় বসবাস করছেন। অতীতে তিনি দীর্ঘদিন জার্মানিতে বসবাস করেন। বাংলা মিডিয়ার সাংবাদিক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন কর্মরত। অবসর সময় তিনি মাঝেমধ‍্যে লেখালেখি করেন। তার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্হ ‘নিরাপদ নিরাশ্রয়’।

সম্পাদক: মিজান রহমান
প্রকাশক: বিএসএন মিডিয়া, এডিনবরা, স্কটল্যাণ্ড থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: