সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আমাদের ওয়েবসাইটে স্বাগতম (পরীক্ষামুলক স¤প্রচার)

স্কটল্যান্ডে করোনা ভাইরাস (বিস্তারিত)

কাগজের ঠোঁস (ছোট গল্প)




ডাঃ ফারহানা মোবিন (২৯ ডিসেম্বর ২০১৮) :

জানালার পর্দা উঠানোয় ছিল। নফেল চুপি চুপি দেখতে গেল যে রাস্তায় দাঁড়ানো ছেলেটা এখনো আছে কিনা? সে হতবাক হয়ে গেল, ছেলেটি এখনো রাস্তায় দাঁড়ানো। নফেল কে দেখে ছেলেটা কিছুটা আড়াল হয়েগেল। নফেলের খুব ভয় লাগতে শুরু করল। মাম মাম তো অফিসে, বাবাও অফিসে। রান্নাঘরে কাজ করছে জরিনা। বাসায় আর কেউ নায়। এই বন্দীজীবন নফেলের আর ভালো লাগেনা। টিভি দেখতেও ভালো লাগেনা। শুধু পড়াআর পড়া। এতো পড়া, ক্লাস টেস্ট আর ভালো লাগেনা। টিংটং। হঠাৎ বেজে উঠল কলিং বেল। নফেল লাফ দিয়ে গেল দরজা খোলার জন্য।

জরিনা তখন বাথরুমে গোসল করছিল। জরিনা চিৎকার করে বললঃ নফেল না চিনলে দরজা খুলবানা। নফেল দরজার গ্লাস দিয়ে দেখল পেপারওয়ালা। খুশীতে ভরে উঠল তার মন।

পেপারওয়ালাঃ ভাই পেপার আছে?

নফেলঃ আছে, বই খাতাও আছে।

পেপারওয়ালাঃ ভাই তাড়াতাড়ি করেন। বাজারে মন্দা চলছে, ৫ কেজি বই খাতার দাম হলো ৫ টাকা। কত টাকা ঠকে গেল তা দিয়ে নফেলের কোন চিন্তা হলো না।নফেল টাকার কথা চিন্তা করল না। স্কুলের জরুরী কিছু বই পত্রও বিক্রি করেদিল। পেপারওয়ালা কাগজের ডালি উঁচু করে মাথায় উঠাতে যেয়েই নফেল দেখল সেই ছেলেটা। বিস্ময় আর ভয়ে নফেলের হাত ঘেমে উঠল।

পেপারওয়ালার দাড়িপাল্লা হাতে নিয়ে সিড়ি দিয়ে ছেলেটা নামছে। জরিনা বাথরুমেই আছে। নফেল পেপারওয়ালার পিছু নিল। বেলা দুপুর তিনটা। হাটতে হাটতে পেপারওয়ালা পৌছে গেল রায়ের বাজারের বস্তিতে। ছোট্ট খড়ের ঘর। টিনের চালা উপরে। নীচে কাদা, পানি; স্যাঁতসেতে গন্ধযুক্ত ঘর। রাস্তা থেকে ঘরে যাবার জন্য দুটি বাঁশ দিয়ে তৈরী পথ। তাতে পেপারওয়ালা আর সেই ছেলেটা দৌঁড়ে পার হল। ঢুকে গেল ছোট একটা ঘরে। দরকায় নোংরা চট ঝুলানো।

নফেল বাঁশের উপর দিয়ে পার হতে পারল না। পা ফসকে পড়ে গেল নোংরা কাদা পানিতে। দুই পা ঢুকে গেল কাদাতে। ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল নফেল।দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হল ‘জ্বালা’। টেনে তুলল ‘নফেলকে’।

ঘরে নিয়ে পা মোছার জন্য কাপড় দিল, কাদা ধোয়ার জন্য পানি দিল। বাকা হয়ে যাওয়া পুরানো হাড়িতে ছিল পানি।‘জ্বালা’: নফেল, তুমি আমাদের পিছু কিয়ের লাগি আইছো ?

‘নফেল’ : তুমি আমার নাম জানো?

‘জ্বালা’: হ, জানি। তুমি তোমাগো জানালা দিয়া বই, খাতা, ফালাও, হ্যাতে তুমার নাম লিখন থাকে।

তুমি ধানমন্ডীর ইংরাজী স্কুলেত পড়ো । এইদ্যাখো, আমার কাছে তুমার বই, খাতা, বইয়ের ছেড়া পাতা।নফেল ভয় আর বিস্ময়ে আরো বেশী নীল হয়ে উঠল ।

সর্বনাশ মাম মাম যদি জেনে যায় যে এগুলো আমি জানালা দিয়ে ফেলেছি, তাহলে কি হবে? তুমাকে আমরা কিছুই করুম না।

নফেলঃ বই, খাতা আর বই এর ছেড়া পাতা দিয়ে তুমি কি করো?

জ্বালাঃ আমরা গরীব। স্কুলেত পড়বার ট্যাকা নায়। একদিন পেপার বিক্রির খোঁজে তুমাগো বাড়ীর কাছে গেছিলাম। আমার এক বন্ধু কইল, তুমি নাকি জানালা দিয়ে বই, খাতা, বইয়ের পাতা ফালাও।

বিক্রির আশায় তুমার বাড়ীর নীচে প্রতিদিন ঘুরতাম। তয়, অহন বিক্রির আশায় না। পড়বার আশাতেও ঘুরি।

নফেলঃ পড়বার আশা?

জ্বালাঃ দ্যাখো, তুমার ছেড়া বই এর পাতাগুলা অহন বই হয়া গ্যাছে। আমাক পড়তে বড়ই ইচ্ছা করে। তুমার ইংরাজী বই গুলান পড়তে পারি না, বাংলা অল্প কিছু পরি।

নফেলঃ তোমাকে কে পড়া শিখিয়েছে?

জ্বালাঃ আমার এক বন্ধু ছিন্নমূল স্কুলেত পড়ে। হ্যারো পড়নের খুব শখ। হেই আর আমি সারা শহর থেইকা কাগজ কুড়াইয়া ঠোস বানায়।

ঠোস হল কাগজের প্যাকেট।পেপারওয়ালাঃ হ্যারে কত মারসি বই এর পাতাগুলা দিয়া ঠোস বানানোর লাগি। ঠোস বানাইলে বিক্রি করি ট্যাকা হতো। শয়তানে লেখাপড়া করার লাগি পাগল। গরীবের কিসের লেহাপড়া?

আমগো জীবন হইলো পেপার বেচা আর ঠোস বানানোর জন্যি।

নফেল বিস্ময় নিয়ে কথাগুলো শুনছিল। তার পড়তে ভালো লাগেনা তাই বই এর পাতা ছিড়ে, জানালা দিয়ে বই ফেলে দেয়। এদের জীবন কি কষ্টের!

দুঃখে নফেল কাঁদতে শুরু করল। কুড়িয়ে আনা কাগজ দিয়ে জীবন চলে কিভাবে?

একটা ছোট্ট কিটকাট চকলেটের দামও তো ত্রিশ টাকা। কষ্টে নফেলের কান্না পেয়ে গেল। নফেল ঠিক করল সে আর কোনদিন বই এর পাতা ছিড়বেনা। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে।

জ্বালাঃ ভাই, তুমি কাইন্দোনা।

রিক্সাতে করে জ্বালা আর নফেল রওনা দিল। নফেলের বাসার সামনে প্রচন্ড ভীড়। বাসাতে পৌছেই নফেল চিৎকার দিয়ে বললঃ কেউ ওকে মেরোনা, ও আমার বন্ধু, ছেলেধরা নয়।

নফেল হারিয়ে গেছে ভেবে নফেলের মাম (মা) অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে জড়িয়ে ধরে নফেলকে। নফেল সব ঘটনা খুলে বলে সবাইকে।নফেলের বাবা, স্কুলে ভর্তি করে দেয় জ্বালাকে। নফেলের কথায় তাকে প্রতিমাসে দেয় এক হাজার টাকা। যেন জ্বালার লেখাপড়া করতে কষ্ট না হয়।দুইদিন পরে হঠাৎ ভোরবেলা জানালার পর্দা সরায় নফেল। মুহূর্তে তারচোখে ফুটে ওঠে আনন্দের ঝিলিক।

‘জ্বালা’ স্কুলে যাবার জন্য ব্যাগকাধে দাঁড়িয়ে। হাত নেড়ে বিদায় জানায় নফেলকে। নফেল পুরানো বই সব জমাতে থাকে জ্বালার জন্য। জ্বালাকে আর বানাতে হয়না কাগজের ঠোস। নফেল আর জ্বালা দুজনেই পড়ালেখা করতে থাকে মনদিয়ে।

ডাঃ ফারহানা মোবিন এমবিবিএস (ডি.ইউ), পোস্টগ্র্যাজুয়েশন (পাবলিক হেল্থ), রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার (গাইনী এন্ড অবস্), স্কয়ার হসপিটাল, ঢাকা । ডায়াবেটোলোজি, বারডেম হসপিটাল। সি কার্ড ( হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল) । উপস্থাপিকা বাংলা টিভি ( অনুষ্ঠান – প্রবাসীর ডাক্তার ) ।

সম্পাদক: মিজান রহমান
প্রকাশক: বিএসএন মিডিয়া, এডিনবরা, স্কটল্যাণ্ড থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: