রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আমাদের ওয়েবসাইটে স্বাগতম (পরীক্ষামুলক স¤প্রচার)

স্কটল্যান্ডে করোনা ভাইরাস (বিস্তারিত)

Sex Cams

স্কটল্যান্ডে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এমএসপি প্রার্থী হলেন আফিফা খানম




 

বাংলাস্কট রিপোর্ট (৮ মার্চ ২০২৬):

স্কটল্যান্ডের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেত্রী আফিফা খানম। প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি নারী হিসেবে তিনি আগামী মে মাসে অনুষ্টিতব্য  স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টি থেকে এমএসপি প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস আসন থেকে তাঁর এই প্রার্থিতা প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক গর্বের মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আফিফা খানম পেশায় একজন  হাইস্কুল শিক্ষক। তিনি গ্লেনরথিস হাইস্কুলের সাবেক প্রিন্সিপাল টিচার, অকটার্ডার কমিউনিটি স্কুলের ডেপুটি হেডটিচার ও বিজনেস ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ও তিনি শিক্ষকতার সাথে জড়িত আছেন।  মানবাধিকার ও সমতা প্রতিষ্টা, সমাজসেবা ও কমিউনিটি উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছেন। সহানুভূতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের জন্য তিনি স্কটল্যান্ডের শিক্ষা অঙ্গনে তিনি সুপরিচিত।

পেশা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি একজন কবি, পাবলিক স্পিকার, কোচ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ। এছাড়া তিনি ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ডে পরিচালিত বিভিন্ন মানবিক ও চ্যারিটেবল উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা।

আফিফা খানমের জন্ম সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট গ্রামে। তাঁর বাবা আব্দুল কুদ্দুছ ছিলেন সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল এবং মা সৈয়দা নেহার বেগম একজন গৃহিণী। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

আফিফার শিক্ষার হাতে খড়ি হয় বারকোট প্রাইমারি স্কুলে। পরে ঢাকা দক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। বিবাহসূত্রে ১৯৮২ সালে পাড়ি জমান স্কটল্যান্ডে। নতুন দেশ ও ভাষাগত চ্যালেঞ্জসহ নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ পেশাগত জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল মানবাধিকার কর্মী, মা ও রাজনীতিবিদ হিসাবে।

স্কটল্যান্ডে তাঁর পড়াশুনা শুরু হয় স্থানীয় কাউন্সিলের ইএসওএল বা কমিউনিটি অ্যাডাল্ট লার্নিং ক্লাসের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি ক্ল্যাকম্যান কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ইউনিভার্সিটি অব স্টার্লিং থেকে স্নাতক (বি.এ) ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর শিক্ষা বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডুকেশনাল লিডারশিপে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া স্কটিশ কোয়ালিফিকেশন অথরিটি থেকে তিনি উচ্চতর হেডশিপ অ্যাওয়ার্ড এবং অ্যাডাল্ট লার্নার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তিনি কমিউনিটি উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তিনি স্কটল্যান্ডে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারন্যাশনাল উইমেন গ্রুপ। এছাড়া তিনি কমিউনিটি লাইফ স্কিল প্রোগ্রামের একজন অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন।

২০১৮ সাল থেকে তিনি গ্লেনরথিসভিত্তিক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান লেইটার লাইফ চয়েস  এর বোর্ড পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন, প্রতিষ্টানটি বয়স্ক মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে শিক্ষামুলক কর্মসুচিতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে আফিফা খানমের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা । ব্রিটিশ কাউন্সিলের কানেক্টিং ক্লাসরুম প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুলের মধ্যে শিক্ষা বিনিময় ও সহযোগিতা প্রকল্প গড়ে তুলতে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছেন।

 আফিফা খানম ২০১২ সাল থেকে স্কটিশ শিক্ষকদের ট্রেড ইউনিয়ন এনএএসইউডব্লিওটি  (NASUWT)–এর সক্রিয় সদস্য। সেখানে তিনি ওয়ার্কপ্লেস প্রতিনিধি, হেলথ অ্যান্ড সেফটি অফিসার ও ইকুয়ালিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি স্কটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিলের ব্লাক ওয়ার্কার কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য তাছাড়া এন্টি রেসিজম ইন এডুকেশন পোগ্রাম (AREP) সহ বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি স্কটিশ পার্লামেন্টের ডাইভার্সিটি ইন দ্য টিচিং প্রফেশন এন্ড এডুকেশন ওয়ার্কফোর্স বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপের একজন সদস্য।

পেশাগত উৎকর্ষতা ও কমিউনিটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। স্কটিশ পাবলিক সার্ভিসে দীর্ঘদিন ধরে রাখা অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর স্কটিশ পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত স্কটিশ পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে  দ্য লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পান। এছাড়া প্রবাসে বাংলাদেশি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি প্রবাসী সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড-এ ভূষিত হন।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আফিফা খানম লেবার পার্টির সমর্থক ছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি ক্ল্যাকম্যানশায়ার কাউন্সিলের উপনির্বাচনে লেবার পার্টির কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বর্তমানে মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস লেবার পার্টির কনস্টিটুয়েন্সি কমিটির চেয়ার হিসাবে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।

এমএসপি হিসাবে নির্বাচিত হলে লেবার পার্টির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন আফিফা খানম। গত ৩০ বছর যাবত শিক্ষকতার সাথে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, স্কটল্যান্ডে শিক্ষার সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। একদিকে ক্লাসে শিক্ষার্থীর পরিমান বাড়ছে অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সুযোগ সুবিধা ক্রমশ কমে আসছে। শিক্ষকদের উপর পড়ছে বাড়তি চাপ। তিনি মনে করেন প্রতিটি শিশুর যথাযথ শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি তার এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্টানগুলোতে  সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছেন। তাছাড়া আফিফা খানম তার নির্বাচনী প্রচারনায় দ্বারিদ্র দুরীকরন, জীবন যাত্রা ব্যয় বৃদ্ধি জনিত প্রভাব কমাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা কর্মসুচী গ্রহন এবং বিভিন্ন পাবলিক সার্ভিস যেমন যাতায়াত ব্যবস্থা ও স্থানীয় ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নকে  অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।  ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে আফিফা খানম বলেন, স্কটল্যান্ডে মাইগ্রেশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কারন এখানে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কর্মক্ষম লোকের সংখ্য হ্রাস পাচ্ছে। স্কটিশ লেবার পার্টি এ ব্যাপারে  কার্যকরী ভুমিকা রাখবে।

নির্বাচনী ক্যাম্পেইন চলাকালে বর্ণবাদী আচরনের শিকার হয়েছেন বলে সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন আফিফা খানম।  এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন আমাদের স্কটিশ সমাজে বর্ণবাদের কোন স্থান নেই। তিনি দৃঢ়চিত্তে এই মর্মে অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন যে বর্ণবাদী আচরনের মাধ্যমে তাঁকে দমিয়ে রাখা যাবে না। তিনি তাঁর লড়াই চালিয়ে যাবেন। আফিফা খানম নির্বাচনে তাঁর জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী, দলের পক্ষ থেকে  ক্রাউড ফান্ডিং এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে চালু হয়েছে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ অভিযান।

উল্লেখ্য, মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস মূলত সেন্ট্রাল ইস্ট স্কটল্যান্ড অঞ্চলের নির্বাচনী আসন যা ঐতিহাসিকভাবে শ্রমজীবী ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। রাজধানী শহর এডিনবরা থেকে ৩২ মাইল ‍উত্তরে অবস্থিত। আসনটি ফাইফ কাউন্সিলের অন্তর্গত। এখানে ৫৫ হাজারের ও বেশী নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এসএনপি এই আসনটিতে জয়লাভ করে এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালের স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে দলটি আবারও আসনটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এই আসনের বর্তমান এমএসপি হলেন জেনি গিলরুথ, স্কটিশ পার্লামেন্টের সেক্রেটারী ফর এডুকেশন এন্ড স্কিল। আসন্ন নির্বাচনে এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

আফিফা খানমের ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে যাদের সকলেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। সপরিবারে ফাইফ কাউন্সিলের গ্লেনরথিস শহরে বসবাস করছেন।

প্রথমবারের মত একজন বাংলাদেশী হিসাবে স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাঁর এই মনোনয়নকে স্কটল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি গৌরবজনক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাস্কটের সাথে আলাপ কালে আফিফা খানম বলেন, যুক্তরাজ্যে  বাংলাদেশী নারীরা এগিয়ে আছেন কিন্তু স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশী নারীরা কমিউনিটির যথাযথ সহায়তা ও সমর্থন পেলে  রাজনীতিতে তারা এগিয়ে আসবেন। সচেতন মহল মনে করেন আফিফা খানমের পদাঙ্ক অনুসরন করে  ভবিষ্যতে স্কটিশ বাংলাদেশী নারীরা মুলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হবেন।

রিপোর্ট: মিজান রহমান, বাংলাস্কট

সম্পাদক: মিজান রহমান
প্রকাশক: বিএসএন মিডিয়া, এডিনবরা, স্কটল্যাণ্ড থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: